
জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে ঋণের চাপে হীরা মনি (২৮) নামের এক গৃহবধূর আত্মহত্যার অভিযোগ উঠেছে। তিনি উপজেলার রায়কালী ইউনিয়নের আমানপুর উত্তরপাড়া গ্রামের ভ্যানচালক মাসুদ রানার স্ত্রী। তিনি বিভিন্ন এনজিও থেকে প্রায় তিন লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন।
পরিবার, থানা পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার রায়কালী ইউনিয়নের আমানপুর উত্তরপাড়া গ্রামের ভ্যানচালক মাসুদ রানা তার স্ত্রী হীরা মনির নামে ‘দাবি উন্নয়ন মৌলিক সংস্থা’ এনজিওসহ গ্রামীণ ব্যাংক, ব্র্যাক, আরডা সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতিসহ বিভিন্ন সমিতি এবং এনজিও থেকে বসতবাড়ির জমি ক্রয়ের জন্য প্রায় তিন লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। তাকে প্রতিদিন ১ হাজার ৫০০ টাকা করে দুই থেকে তিনটি ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হতো। ভ্যানচালক স্বামী দরিদ্র হওয়াই তার পক্ষে এত টাকা কিস্তি পরিশোধ করা কষ্টকর হয়ে যেত।
একপর্যায়ে ওই এনজিওগুলো প্রতিনিয়ত তাকে এবং তার স্ত্রীকে কিস্তির জন্য তাগাদা দিতে থাকে। এই ঘটনায় সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। এর জের ধরে গৃহবধূ হীরা মনি শনিবার দুপুরে সবার অগোচরে গোসলখানায় আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে ইঁদুর নিধনের গ্যাস বড়ি খেয়ে ফেলে। এ সময় তার মেয়ে রানী দেখতে পেয়ে বাধা দিলেও সে ব্যর্থ হয়। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য নওগাঁ হাসপাতালে নেওয়ার সময় পথিমধ্যে তার মৃত্যু হয়।
নিহতের ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়ে রাণী (১৩) বলেন, ‘আমার মায়ের নামে অনেক এনজিওর ঋণ ছিল। এনজিওর লোকেরা বাড়িতে এসে কিস্তির জন্য সবসময় বলতে থাকত। টাকার সমস্যার জন্য কিস্তি দিতে পারত না। তাই আজ মানসিক চাপে আমার মা আত্মহত্যা করেছে।’
নিহতের স্বামী মাসুদ রানা বলেন, ‘দাবি এনজিও থেকে ষান্মাসিক ৩৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলাম। আর্থিক সমস্যার কারণে পরিশোধ করতে পারিনি। শনিবার দাবি উন্নয়ন মৌলিক সংস্থা এনজিওর লোকজন এসে আমার স্ত্রীর সামনে আমাকে ঋণ পরিশোধের তাগাদা দিলে সময় চাই। এতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে আমার স্ত্রী গোপনে গ্যাস বড়ি খেয়ে আত্মহত্যা করে।
গ্রামীণ ব্যাংকের তিলকপুর শাখার ওই এলাকার মাঠকর্মী মিজানুর বলেন, ‘সে নিয়মিত ঋণের টাকার কিস্তি প্রদান করত। এখনও তার প্রায় আনুমানিক ৪৭ হাজার বকেয়া আছে। তার আত্মহত্যার বিষয়টি শুনে আমি নিজেও অবাক। আমার মনে হয় না সে ঋণের টাকার জন্য আত্মহত্যা করেছে।’
গ্রামীণ ব্যাংকের তিলকপুর শাখার ব্যবস্থাপক ফরহাদ মিঞা বলেন,‘নিহত হীরা মনি আমাদের নিয়মিত গ্রাহক ছিলেন। সে নিয়মিত প্রতি সপ্তাহের মঙ্গলবার দিনে আমাদের কিস্তি পরিশোধ করতেন। তার সঙ্গে আমাদের কোনো সমস্যা ছিল না।’
ব্র্যাকের রায়কালী শাখার ব্যবস্থাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন,‘ওই নারী আমাদের শাখা থেকে ৪০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। তিনি প্রথম কিস্তি ৪ হাজার টাকা দেওয়ার পরে গত ২ মাস থেকে অসুস্থতার কথা জানিয়ে কোনো কিস্তি দেয়নি। তবে কিস্তির জন্য তাকে কখনো কোনো চাপ প্রয়োগ করা হয়নি।’
আরডা সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতির শাখা ব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলাম বলেন,‘আমাদের সমিতিতে তার সাপ্তাহিক আটশ’ টাকা ঋণ ছিল। অসুস্থতার জন্য তিনি গত শনিবার চারশ’ টাকা কিস্তি দিয়েছিলেন। তার সঙ্গে আমাদের কোনো ঝামেলা হয়নি।’
দাবি উন্নয়ন মৌলিক সংস্থার নির্বাহী পরিচালক আশরাফুন নাহার বলেন, ‘যিনি মারা গেছেন তিনি আমাদের গ্রাহক ছিলেন। তার ঋণ পরিশোধের সময় এখনও আসেনি। তাছাড়া শনিবার আমাদের অফিস ছুটি ছিল। ছুটির দিনে কোনো গ্রাহকের বাড়িতে গিয়ে ঋণ আদায় বা তাগাদা দেওয়ার কথা নয়। তবে তাকে কোনো সময় ঋণের জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়নি।’
আক্কেলপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবু বক্কর সিদ্দীক বলেন, ‘এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। নিহত হীরা মনির মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। তবে ঋণের জন্য মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যা করেছে বলে তার মেয়ে, স্বামী ও স্থানীয়রা জানিয়েছেন।’
আপনার মতামত লিখুন :