

এডভোকেট মোহাম্মদ সরোয়ার হোসাইন লাভলু
মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালি জাতি ১৯৭১ সালে যে বিজয় অর্জন করেছিল, তা কেবল একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতার নয়, এটি ছিল জাতির মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার বিজয়। পাকিস্তানি শাসনের শোষণ ও নির্যাতনের শৃঙ্খল ভেঙে এক নতুন জাতি গঠনের স্বপ্ন দেখেছিল মুক্তিকামী বাঙালি। এই বিজয়ের পেছনে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সাহসী পদক্ষেপ ও দূরদর্শী নেতৃত্ব অনস্বীকার্য।
স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ জিয়াউর রহমান কেবলমাত্র মুক্তিযুদ্ধের সামরিক নেতৃত্ব দেননি, তিনি জাতিকে স্বাধীনতার দিশা দেখান। তার নেতৃত্বে পরিচালিত গেরিলা যুদ্ধ কৌশল শত্রুকে দুর্বল করে এবং মুক্তিকামী জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে। জিয়াউর রহমানের আদর্শ ছিল স্বাধীনতা, গণতন্ত্র এবং সমতার ভিত্তিতে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়া।
মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশকে নতুন করে গড়ে তোলার প্রয়াসে ১৯৭৮ সালে শহীদ জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্রের সূচনা করেন এবং দেশের রাজনীতিতে বহুমাত্রিক চিন্তার জায়গা তৈরি করেন। তার নেতৃত্বে কৃষি ও শিল্পখাতে উন্নতি, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, এবং একটি স্থিতিশীল অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি হয়।
বিএনপির আদর্শ ছিল এমন একটি বাংলাদেশ গড়া যেখানে প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা পাবে। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে এই আদর্শকে বারবার বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে।
রাজনৈতিক দমন-পীড়ন: বিএনপির লড়াই ও ত্যাগ:
বিএনপি এবং এর নেতাকর্মীরা রাজনৈতিক দমন-পীড়নের শিকার হয়ে আসছে। গুম, খুন, হামলা-মামলা, এবং নিপীড়ন বিএনপির রাজনীতির অঙ্গনকে করে তুলেছে অত্যন্ত সংকটপূর্ণ।
বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতা, হত্যা, নাশকতা, এবং জঙ্গিবাদের মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছে। গায়েবি মামলায় হাজার হাজার নেতাকর্মীকে ফাঁসানো হয়েছে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কারাগারে আটক রাখা হয়। তার চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করা এবং বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া রাজনৈতিক হয়রানির একটি জ্বলন্ত উদাহরণ।
২০২৪: ছাত্র-জনতার বিপ্লব ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার বিপ্লব বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। গুম-খুন, দমন-পীড়ন, এবং ন্যায়বিচারের অভাবে ক্ষুব্ধ জনগণ রাজপথে নেমে আসে। ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক আন্দোলন দেশে একটি নতুন আশার সঞ্চার করে।
এই আন্দোলনের পটভূমিতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান জাতির উদ্দেশ্যে ৩১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তার এই কর্মসূচি দেশের গণতন্ত্র, সুশাসন, এবং মানবাধিকারের পুনঃপ্রতিষ্ঠার রূপরেখা।
তারেক রহমানের ৩১ দফা কর্মসূচি: নতুন বাংলাদেশের দিশা
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দেশনায়ক তারেক রহমান তার ৩১ দফা কর্মসূচিতে জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছেন।
৩১ দফার মূল বিষয়সমূহ:
১. গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা:
নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন।
ভোটের নিরাপত্তা ও জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা।
২. আইনের শাসন:
স্বাধীন বিচার বিভাগ ও সুশাসন নিশ্চিত করা।
গুম-খুন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার।
৩. শিক্ষা ও কর্মসংস্থান:
প্রযুক্তি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা চালু।
তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি।
৪. নারীর ক্ষমতায়ন ও সংখ্যালঘু অধিকার:
নারীর নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা।
সংখ্যালঘুদের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অধিকার রক্ষা।
৫. পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা:
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় টেকসই পরিকল্পনা।
৬. দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই:
দুর্নীতিবাজদের শাস্তি এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত।
নতুন বাংলাদেশ গঠনের দিশা
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি গণতন্ত্র, মানবাধিকার, এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নতুন বাংলাদেশ গঠনে বদ্ধপরিকর। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার বিপ্লব একই উদ্দেশ্যে পরিচালিত—গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা।
বিজয় দিবস ২০২৪-এ জাতি তার ত্যাগ ও অর্জন স্মরণ করছে। শহীদ জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনতার যে ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল, তা আজ তারেক রহমানের হাত ধরে একটি সমৃদ্ধ, গণতান্ত্রিক, এবং ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গঠনে অগ্রসর হচ্ছে।
গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচারের প্রতি অঙ্গীকার নিয়ে বিএনপি তারেক রহমানের নেতৃত্বে একটি নতুন বাংলাদেশ গঠনে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য, নতুন প্রজন্মের জন্য একটি স্থিতিশীল এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশ উপহার দেওয়ার লক্ষ্যেই বিজয় দিবস ২০২৪ জাতির কাছে একটি নতুন সূচনা।
লেখক: এডভোকেট মোহাম্মদ সরোয়ার হোসাইন লাভলু, অতিরিক্ত জেলা পিপি, চট্টগ্রাম
আপনার মতামত লিখুন :