

এড মোঃ সরোয়ার হোসাইন লাভলু:
সীতাপুর গ্রামের সাইদুল মোল্লা ছিলেন এক দুর্ধর্ষ প্রতারক। ক্ষমতার জোরে জমি দখল এবং ভুয়া দলিল তৈরি করে মানুষকে হয়রানি করা তার নেশা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অন্যদিকে কাদের আলী ছিলেন একেবারে সৎ কৃষক। তার তিন বিঘা জমি, যা তার পরিবারের বংশ পরম্পরায় ছিল, তা-ই ছিল তার পরিবারের একমাত্র জীবিকা।
একদিন সকালে কাদের দেখতে পান, তার জমিতে সাইদুলের লোকজন ট্রাক্টর নিয়ে এসে চাষাবাদ শুরু করেছে। প্রতিবাদ করতে গেলে সাইদুল ধমক দিয়ে বলে, “এই জমি এখন আমার। যা ইচ্ছে কর, কিন্তু এই জমি আর তোর নয়।”
কাদের আলীর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। হতাশ কাদের বাড়ি ফিরে স্ত্রী রাবেয়াকে পুরো ঘটনা জানালে রাবেয়া বলেন, “তুমি এভাবে হাল ছেড়ে দিতে পার না। এটা আমাদের জমি। আমরা আইনের আশ্রয় নেব।”
আইনের আশ্রয় নেওয়া:
কাদের আলী শহরে গিয়ে আইনজীবী ফারুক আহমেদের কাছে সাহায্য চান। ফারুক পুরো বিষয়টি শোনার পর বলেন, “আপনার জমি নিয়ে প্রতারণা করা হয়েছে। কিন্তু আপনি চিন্তা করবেন না, আমি আইনের মাধ্যমে আপনার জমির অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করব।”
ফারুক প্রথমেই কাদেরের জমির দলিল পরীক্ষা করেন। দলিল পরীক্ষা করে দেখা যায়, জমিটি বৈধভাবে কাদেরের নামে রেকর্ডকৃত। এরপর তিনি সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের আশ্রয় নিয়ে মামলা দায়ের করেন।

সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন ও দন্ডবিধি প্রয়োগ:
ফারুক মামলা করেন সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭ (Specific Relief Act, 1877)-এর ৯ ধারা অনুযায়ী, যা বলে—
“কোনো ব্যক্তি যদি বেআইনিভাবে জমি থেকে উৎখাত হয়, তবে প্রকৃত মালিক জমি পুনরুদ্ধারের জন্য আদালতে মামলা করতে পারেন।”
এছাড়াও, ফারুক মামলার শক্তি বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশ দন্ডবিধি, ১৮৬০-এর ধারা ৪৬৭ (Forgery of valuable security), ৪৬৮ (Forgery for purpose of cheating), এবং ৪৭১ (Using as genuine a forged document) এর অধীনে সাইদুলের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণের উদ্যোগ নেন।
সাইদুলের ষড়যন্ত্র:
মামলার খবর পেয়ে সাইদুল হুমকি-ধমকি শুরু করে। তার লোকজন কাদেরের বাড়ির আশপাশে ঘোরাফেরা করে ভীতি সৃষ্টি করে। এমনকি সাইদুল আইনজীবী ফারুককে ঘুষ দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ফারুক সোজাসাপ্টা বলেন, “আইন কোনো অন্যায়কে সমর্থন করে না। আমি সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করি।”
আদালতে মামলা পরিচালনা:
আদালতে ফারুক জমির আসল দলিল, ভূমি রেকর্ড এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য উপস্থাপন করেন। এছাড়াও, তিনি সাইদুলের জমা দেওয়া ভুয়া দলিলের অসঙ্গতি তুলে ধরে প্রমাণ করেন যে এটি ভুয়া এবং প্রতারণার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে।
ফারুক যুক্তি দেন:
“মহামান্য আদালত, আমার মক্কেলের জমি বেআইনিভাবে দখল করা হয়েছে। আসামি সাইদুল মোল্লা ভুয়া দলিল তৈরি করে প্রতারণা করেছেন, যা দন্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৪৬৭, ৪৬৮ এবং ৪৭১ ধারা অনুযায়ী গুরুতর অপরাধ।”
সুনির্দিষ্ট প্রতিকারের নির্দেশনা:
বিচারক সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইনের ভিত্তিতে রায় দেন:
১. জমির প্রকৃত মালিক কাদের আলী। জমি অবিলম্বে কাদেরের দখলে ফিরিয়ে দিতে হবে।
২. সাইদুল মোল্লাকে দন্ডবিধি, ১৮৬০-এর ধারা ৪৬৭, ৪৬৮ এবং ৪৭১-এর অধীনে ৩ বছরের কারাদণ্ড এবং ৫০,০০০ টাকা জরিমানা করা হয়।
৩. কাদের আলীর আইনজীবী ফারুকের আইনি খরচ সাইদুলকে বহন করতে হবে।
ন্যায়বিচারের উদাহরণ:
রায় ঘোষণার পর কাদের আলীর পরিবার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। গ্রামের মানুষ এই ঘটনায় শিক্ষা পায় যে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আইনই সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
ফারুক কাদেরকে বলেন, “আপনার জমি আপনার অধিকার। আইন সব সময় সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে থাকে।”
কাদের আলীর চোখে আনন্দের অশ্রু, আর সাইদুল মোল্লা আদালতের রায়ের পর গ্রামে মুখ দেখাতে পারল না।
আইন সংযুক্তি:
গল্পে উল্লেখিত সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন এবং দন্ডবিধি:
১. সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭-এর ৯ ধারা: জমির প্রকৃত মালিককে তার অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার সুযোগ দেয়।
২. দন্ডবিধি, ১৮৬০-এর ধারা ৪৬৭: মূল্যবান দলিল জাল করার অপরাধ।
৩. দন্ডবিধি, ১৮৬০-এর ধারা ৪৬৮: প্রতারণার উদ্দেশ্যে জাল দলিল তৈরি করার অপরাধ।
৪. দন্ডবিধি, ১৮৬০-এর ধারা ৪৭১: জাল দলিলকে সত্য হিসেবে উপস্থাপন করার অপরাধ।
এই গল্পের মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, বেআইনি জমি দখল ও প্রতারণার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন এবং দন্ডবিধির সঠিক প্রয়োগে ন্যায়বিচার পাওয়া সম্ভব।
লেখক: এডভোকেট মোঃ সরোয়ার হোসাইন লাভলু
অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর , জেলা ও দায়রা জজ আদালত, চট্টগ্রাম ও চেয়ারম্যান দিশারী যুব ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ।
আপনার মতামত লিখুন :