চট্টগ্রাম মেডিকেলের অবহেলায় দৈনিক সাঙ্গু সম্পাদকের মায়ের মৃত্যু: বিচারের দাবী করলেন কবির হোসেন সিদ্দিকী 


প্রকাশের সময় : ডিসেম্বর ২৩, ২০২৪, ১০:৩৪ পূর্বাহ্ণ / ১৫১
চট্টগ্রাম মেডিকেলের অবহেলায় দৈনিক সাঙ্গু সম্পাদকের মায়ের মৃত্যু: বিচারের দাবী করলেন কবির হোসেন সিদ্দিকী 
Spread the love

এড মোঃ সরোয়ার হোসাইন লাভলু

কবির হোসেন সিদ্দিকী, দৈনিক সাঙ্গু পত্রিকার সম্পাদক, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির শিকার হয়ে তাঁর মায়ের মৃত্যুর হৃদয়বিদারক ঘটনার বিবরণ তুলে ধরেছেন। ২০০৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর, শ্বাসকষ্টে ভোগা তাঁর মা শামসুর নাহার চট্টগ্রাম মেডিকেলে চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পরেও হাসপাতালের দুর্নীতি, হয়রানি ও অনৈতিক আচরণ তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে।
কবির হোসেন বলেন, “ছেলের কাঁধে মায়ের লাশ বহন করা পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী বোঝা।” চট্টগ্রাম মেডিকেলের চিকিৎসকদের অবহেলার কারণে তিনি নিজের হাতে মাকে চিরতরে বিদায় দিতে বাধ্য হন। মায়ের প্রতি ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা এবং চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি আক্রোশ নিয়ে তিনি বলেন, “আজও আমি কাঁদি, যখন মায়ের কথা মনে পড়ে।”
২২ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় বান্দরবান সদর হাসপাতাল থেকে তাঁর মাকে চট্টগ্রাম মেডিকেলে নিয়ে আসা হয়। হাসপাতালের গেটে পৌঁছানোর পর থেকেই দুর্নীতির শুরু। একজন ওয়ার্ড বয় মাকে ট্রলিতে ওঠানোর জন্য ২০ টাকা দাবি করেন। পরে আরও ১০ টাকা দিতে হয়। ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে নিয়ে যাওয়ার পর ঘণ্টার পর ঘণ্টা চিকিৎসার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। শ্বাসকষ্টে ভোগা মাকে দেখতে ডাক্তার আসতে প্রায় এক ঘণ্টা লেগে যায়। এরপর চিকিৎসা শুরু না করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করতে বলা হয়।
কবির জানান, “অক্সিজেন দেওয়ার জন্য হাসপাতালের সরবরাহ থেকে কোনো সিলিন্ডার পাইনি। বাধ্য হয়ে হাসপাতালের পাশের একটি ফার্মেসি থেকে দৈনিক ৫০০ টাকায় অক্সিজেন সিলিন্ডার ভাড়া নিয়ে আসি।” চিকিৎসার সরঞ্জাম জোগাড় করার পরেও সেগুলো মাকে দেওয়ার জন্য নার্সদের পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।
রাতভর দৌড়াদৌড়ি করেও মায়ের অবস্থা ভালো করা যায়নি। রাত তিনটার দিকে মায়ের অবস্থা আরও খারাপ হলে ডাক্তারকে ডাকা হয়। কিন্তু ডাক্তার এসে শুধু স্যালাইন আর ইনজেকশনের পরামর্শ দিয়ে চলে যান। নার্সদের বারবার ডাকলেও তাঁরা ব্যস্ত থাকার অজুহাত দেন। অবশেষে সকাল ১০টায় কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, তাঁর মা আর বেঁচে নেই।
মায়ের মৃত্যুতে শোকাহত পরিবারকে লাশ পরিবহনের জন্য ওয়ার্ড বয়দের অর্থ দিতে হয়। কবির অভিযোগ করেন, “মৃত্যুর পরও মাকে শান্তিতে বিদায় দিতে পারিনি। হাসপাতালের ওয়ার্ড বয়রা আমাদের কাছ থেকে লাশ নেওয়ার জন্য টাকা আদায় করেছে।”
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগীদের জন্য নেই পর্যাপ্ত অক্সিজেন সিলিন্ডার, প্রয়োজনীয় ওষুধ বা সেবা। ওয়ার্ডগুলোর পানির সংকট, টয়লেটের অব্যবস্থাপনা, এবং চিকিৎসকদের অমানবিক আচরণ রোগীদের জীবন বিষিয়ে তুলেছে। নার্স ও ওয়ার্ড বয়দের দুর্ব্যবহার, রোগীদের জিনিসপত্র চুরি, এবং প্রয়োজনীয় সেবা না দেওয়ার অভিযোগ প্রতিনিয়ত পাওয়া যায়।
মায়ের মৃত্যুর জন্য হাসপাতালের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করে কবির হোসেন বলেন, “চট্টগ্রাম মেডিকেল এখন অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতীক। আমি এর বিচার চাই। আমার মায়ের মতো আর কোনো রোগীকে যেন এভাবে চিকিৎসার অভাবে মরতে না হয়।”
তিনি আরও বলেন, “আমার মা আমাকে বাবা বলে ডাকবেন না আর কখনো। কিন্তু তিনি চিরদিন আমার অস্তিত্বে বেঁচে থাকবেন।
এই করুণ ঘটনা বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থার চরম ব্যর্থতার প্রতীক। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো দেশের বৃহৎ চিকিৎসাকেন্দ্রের এমন অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি বন্ধে কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। কবির হোসেনের এই হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, মানুষের জীবনের প্রতি চিকিৎসা ব্যবস্থার দায়বদ্ধতা এবং মানবিকতার কতটা অভাব রয়েছে।
Translate »