

অ্যাডভোকেট মোঃ সরোয়ার হোসাইন লাভলু
অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর, জেলা ও দায়রা জজ আদালত, চট্টগ্রাম
বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপিত হয়, যা নারীর ক্ষমতায়ন, সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা এবং নারীর প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের প্রতীক। বাংলাদেশও এই বিশ্ব আন্দোলনের অংশ, যেখানে নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। শিক্ষা, প্রশাসন, আইন, বিচার, রাজনীতি ও অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে আজ নারীদের দৃশ্যমান ভূমিকা রয়েছে। তবে নারী স্বাধীনতা যেন শালীনতা ও নৈতিকতার সীমা অতিক্রম না করে, সে বিষয়েও সমাজকে সচেতন থাকতে হবে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে নারীর ক্ষমতায়নের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং গণতন্ত্রের আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে তিনি দলের হাল ধরেন এবং সফলভাবে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শুধু প্রধানমন্ত্রী হওয়া নয়, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে তাঁর অবদান আজ ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। বেগম খালেদা জিয়া প্রমাণ করেছেন, নারীরা শুধু পরিবার নয়, রাষ্ট্র পরিচালনাতেও যোগ্য নেতৃত্ব দিতে পারে। তার সংগ্রামী জীবন বাংলাদেশের নারীদের জন্য একটি অনুপ্রেরণা।
ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে নারীর মর্যাদা ও অধিকার সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত হয়েছে। ইসলাম নারীকে যথাযথ সম্মান দিয়েছে, শিক্ষা অর্জনকে ফরজ করেছে এবং সম্পত্তির উত্তরাধিকার, বিবাহে সম্মতি ও বিচ্ছেদের অধিকার নিশ্চিত করেছে। ইসলাম নারীকে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের অনুমতি দিয়েছে, তবে এর সাথে নারীর শালীনতা, চরিত্র ও মর্যাদা রক্ষার কঠোর নির্দেশনাও দিয়েছে। ইসলামে নারী কখনোই অবাধ্য চলাফেরা, অশালীন পোশাক কিংবা ধূমপান ও অনৈতিক কাজে লিপ্ত হওয়ার স্বাধীনতা পায়নি। বরং ইসলাম নারীকে আত্মমর্যাদা ও নৈতিক মূল্যবোধের চর্চার মধ্য দিয়ে উন্নতির পথ দেখিয়েছে।
বাংলাদেশের বিচার ও প্রশাসনে নারীর ভূমিকা এখন দৃশ্যমান ও প্রশংসনীয়। হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে বেশ কয়েকজন নারী বিচারপতি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন, যা নারী ক্ষমতায়নের বাস্তব চিত্র। ১৯৫৭ সালে ভাষা মতিন প্রথম নারী আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন, সেই পথ বেয়ে আজ অসংখ্য নারী আইনজীবী আদালতে সফলতার সঙ্গে কাজ করছেন। চট্টগ্রামের প্রথম নারী জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমও তার কর্মদক্ষতা ও সততার মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন, নারীরা প্রশাসনিক নেতৃত্বেও পিছিয়ে নেই। আজকে নারীরা দেশের পুলিশ প্রশাসন, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর মত দেশের সকল বাহিনীতে সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন ।
তবে নারীর ক্ষমতায়নের নামে কিছু অপ্রত্যাশিত প্রবণতাও আমাদের সমাজে ঢুকে পড়েছে, যা নিয়ে ভাবতে হবে। নারী স্বাধীনতার নামে অবাধ্য চলাফেরা, রাতের পার্টিতে অংশগ্রহণ, প্রকাশ্যে ধূমপান ও অশ্লীল পোশাক পরিধান আজ কিছু নারীর মধ্যে ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি শুধু ইসলামের বিধানের পরিপন্থী নয়, বরং সামাজিক মূল্যবোধ ও পারিবারিক সৌন্দর্যকেও নষ্ট করছে। নারী স্বাধীনতা কখনোই লাগামহীন স্বাধীনতার নাম নয়, বরং নিজের মর্যাদা রক্ষা করে আত্মমর্যাদাশীলভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রে অবদান রাখাই প্রকৃত স্বাধীনতা।
নারী দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত—নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা, যাতে তারা শিক্ষিত, আত্মপ্রত্যয়ী, নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন ও সমাজের উন্নয়নে অবদান রাখতে সক্ষম হয়। বেগম খালেদা জিয়ার মতো আত্মবিশ্বাসী, ত্যাগী ও নেতৃত্বগুণসম্পন্ন নারীরাই হোক আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের অনুপ্রেরণা। নারীর ক্ষমতায়ন মানে কখনোই অশ্লীলতা বা ধর্ম ও সংস্কৃতিবিরোধী আচরণ নয়, বরং শিক্ষা, নৈতিকতা, নেতৃত্ব ও আত্মমর্যাদায় বলীয়ান হয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো যোগ্যতা অর্জন করাই নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়ন।
শুভ বিশ্ব নারী দিবস ২০২৫।
আপনার মতামত লিখুন :