

মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত আসামীরা হলেন উজ্জ্বল জলদাস ও সজল জলদাস। মামলার এজাহার, আসামীদের ফৌঃ কাঃ বিঃ ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, অভিযোগপত্র, সি ডি এবং প্রদত্ত সাক্ষ্য প্রমানে প্রসিকিউশনের মামলা সংক্ষেপে এই যে, এজাহারকারী সাবিত্রী জলদাশের স্বামী অসীম জলদাশ জেলে হিসাবে মাছ ধরিয়া জীবিকা নির্বাহ করেন। অসীম জলদাশ গত ০৭/০৭/২০১৩ ইং তারিখ রাত অনুমান ৯.০০ ঘটিকার সময় তাহার বসত বাড়ীর অনুমান ১৫০ গজ দূরে দোকানে মশার কয়েল আনতে যায়। এজাহারকারীর স্বামী অসীম জলদাশ গত ০৭/০৭/২০১৩ ইং রাত্র অনুমান ১১.০০ ঘটিকার সময় ঘরে ফিরে না আসায় তাহারা খোঁজাখুঁজি করিতে থাকেন। তাহাদের বসত বাড়ীর দক্ষিণে সোনাই খাল। সোনাই খালের দক্ষিনে বিনাজুরী ইউনিয়নের পশ্চিম বিনাজুরী গ্রাম। পশ্চিম বিনাজুরী ও মোবারক খিলের মধ্যবর্তী স্থানে সুইচ গেইট। তাহাদের বাড়ীর দক্ষিনে সুবোধ বড়ুয়ার বাড়ী ও পুকুর যাহা পশ্চিম বিনাজুরী গ্রামে। তাহারা খোঁজাখুঁজি করাকালে সুবোধ বড়ুয়ার বাড়ীর পুকুরের পশ্চিম কোনায় পুকুরের পাড়ে তাহার স্বামী অসীম জলদাশের পড়নের লুঙ্গি পান। স্বামীর লুঙ্গির পাওয়ার পর খোঁজাখুঁজি করিয়া পশ্চিম বিনাজুরী সুইজ গেইট সংলগ্ন সুইজ গেইটে কর্মরত কর্মচারীদের বন্ধ অফিসের পিছনে ০৮/০৭/১৩ ইং তারিখ আনুমানিক ৮.০০ ঘটিকার সময় দুইটি সেফটি ট্যাংকের পূর্ব পার্শ্বের সেফটি ট্যাংক এর ভিতরে তাহার স্বামীর মৃত লাশ পান। তাহার স্বামীর মৃত লাশ দেখা না যাওয়ার জন্য সেফটি ট্যাংক এর ভিতর কিছু গাছের পাতা দিয়া ঢেকে রাখতে দেখেন। তাহার স্বামীর মৃত লাশ সেফটি ট্যাংক থেকে উপরে উঠাইলে দেখতে পান তাহার স্বামীর গলার দুই পার্শ্বে ধারালো ছুরি, ঢুকাইয়া দিয়া হত্যার করিয়াছে। হত্যাকারীরা তার স্বামীর লাশ গোপন করিবার জন্য পরিকল্পিতভাবে উক্ত সেফটি ট্যাংকের ভিতরে লাশ ঢুকাইয়া ঢাকনা দিয়া এবং ঢাকনার মধ্যবর্তী গোল ছিদ্রটিতে গাছের পাতা দিয়ে ঢাকিয়া লুকাইয়া রাখে। তাহার স্বামীকে গত ০৭/০৭/২০১৩ তারিখ আনুমানিক ৯.০০ ঘটিকার পর হতে গত ০৮/০৭/২০১৩ ইং তারিখ আনুমানিক ৬.০০ ঘটিকার মধ্যে যে কোন সময়ে প্রানে হত্যা করিয়া সেফটি ট্যাংকের ভিতর হত্যাকরীরা লুকিয়ে রাখে। তাহার স্বামীর মৃত সংবাদ শুনিয়া থানা হইতে পুলিশ গিয়া মৃত লাশের সুরুতহাল রিপোর্ট প্রস্তুত করিয়া ময়না তদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কালেজ হাসপাতল মর্গে প্রেরণ করেন। তিনি স্বামীর খোঁজখবরে ব্যস্ততা সেরে ০৮/০৭/২০১৩ ইং তারিখ থানায় এজাহার দায়ের করেন। পর্যায়ক্রমে ০৩ জন তদন্তকারী কর্মকর্তা মামলাটি তদন্ত করেন। মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা মোঃ খলিলুর রহমান তদন্তভার প্রাপ্ত হয়ে মৃত অসীম জলদাশের এর সুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তুত করেন। ময়না তদন্তের জন্য লাশ চট্টগ্রামে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করেন। আলামত জব্দ করেন। সাক্ষীদের জবানবন্দি ফৌঃ কাঃ বিঃ ১৬১ ধারায় লিপিবদ্ধ করেন। ঘটনাস্থল সরজমিনে পরিদর্শন করে ঘটনাস্হলের খসড়া মানচিত্র ও সূচীপত্র অংকন করেন। তদন্তকালে তিনি আসামী উজ্জল জলদাশ ও সজল জলদাশকে গ্রেপ্তার করেন। জিজ্ঞাসাবাদে আসামীদ্বয় ফৌঃ কাঃ বিঃ ১৬৪ ধারায় দোষ স্বীকারউক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে সম্মত হলে তাদের বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট উপস্থাপন করলে এই ২ জন আসামী ফৌঃ কাঃ বিঃ ১৬৪ ধারায় দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন। মামলাটি সার্বিক তদন্ত ও স্বাক্ষ প্রমাণে আসামী উজ্জল জলদাস ও সজল জলদাস এর বিরুদ্ধে দন্ড বিধির ৩০২/২০১/৩৪ ধারার অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমানিত হওয়ায় রাউজান থানার অভিযোগপত্র নং-১৪১, তারিখঃ ২৪/১০/২০১৩ইং দাখিল করেন। পরবর্তীতে বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট অভিযোগপত্রে আমলে গ্রহণ করে অভিযোগপত্রটি গ্রহণ করে বিচারের নিমিত্তে মামলাটি বিজ্ঞ দায়রা জজ আদালতে প্রেরণ করেন। অতঃপর বিজ্ঞ দায়রা জজ মামলাটি বিচার নিষ্পত্তির জন্য অতিরিক্তি দায়রা জজ, দেউলিয়া বিষয়ক আদালতে প্রেরণ করলে অত্র আদালতে বিগত ০৩/১১/২০১৫৭ ইং তারিখ আসামীদের বিরুদ্ধে দন্ড বিধির ৩০২/২০১/৩৪ ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়। গঠিত অভিযোগ উপস্হিত আসামীদেরকে পাঠ ও ব্যাখ্যা করে শুনানো হলে আসামীদ্বয় নিজেদেরকে নির্দোষ দাবীতে বিচার প্রার্থনা করেন।
প্রসিকিউশন পক্ষ এই মামলায় মোট ১৩ জন সাক্ষীকে পরীক্ষা করেন। আসামীপক্ষ উক্ত সাক্ষীদেরকে জেরা করা হয়। প্রসিকিউশন পক্ষের সাক্ষ্য প্রমান গ্রহণ শেষে আসামীদেরকে ফৌঃ কাঃ বিঃ ৩৪২ ধারায় পরীক্ষা করা হলে উপস্হিত আসামীদ্বয় পুনরায় নিজেদেরকে নির্দোষ দাবী করতঃ সাফাই সাক্ষ্য দিবে বলে বিজ্ঞ আদালতকে জানান। আসামীপক্ষে সাফাই স্বাক্ষী হিসেবে আসামী উজ্জল জলদাশ নিজে এবং তার পিতা সবল জলদাশ ডি-ডব্লিউ-১ এবং ডি-ডব্লিউ-২ হিসেবে স্বাক্ষ্য প্রদান করেন।
আসামীদের প্রদত্ত সাফাই স্বাক্ষী এবং প্রসিকিউশন পক্ষের সাক্ষীদেরকে আসামীপক্ষ কর্তৃক জেরা করার ধরন হতে আসামী পক্ষের যে আত্মরক্ষা মূলক মামলা পাওয়া যায় তা হলো-আসামীগণ সম্পূর্ন নির্দোষ। আসামীদ্বয় এই মামলার হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত নয়। ভিকটিম মদ আসক্ত ছিল। অতিরিক্ত মদ পান করে ভিকটিম মৃত্যুবরণ করে। উক্ত এলাকার কমিশনার নির্যাতন করে এবং পুলিশের নির্যাতনে ভয় দেখিয়ে আসামী উজ্জল জলদাশ ও সজল জলদাশ হতে জোর পূর্বক ফৌঃ কাঃ বিঃ ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করে মিথ্যাভাবে আসামীদেরকে এই মামলায় জড়িত করা হয়েছে।
আদালত মামলার আসামীদের ফৌঃ কাঃ বিঃ ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, অভিযোগপত্র, সি ডি এবং প্রদত্ত সাক্ষ্য প্রমানে প্রসিকিউশন আসামীদের বিরুদ্ধে ৩০২ ও ২৪১ ধারায় মামলার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা ও দয়রা জজ দেউলিয়া বিষয়ক আদালতের বিচারক জনাব মোঃ জাহাঙ্গীর আলম আসামীদেরকে দন্ডবিধির ৩০২ ধারা মোতাবেক মৃত্যু দণ্ডে দণ্ডিত করেন এবং ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। রায়ের দিন আসামীদেরকে চট্টগ্রাম জেলা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আদালত উপস্থিত করা হয় এবং তারা রায়ের সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন। আসামী উজ্জ্বল জলদাস চট্টগ্রামের রাউজান থানাধীন গহীরা মোবারক খান এলাকার সুবল জলদাসের পুত্র এবং আসামি সজল জলদাস একই গ্রামের নির্মল জলদাস এর পুত্র।
রাষ্ট্রপক্ষে দায়িত্ব পালন করেন আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর এডভোকেট মোঃ সরোয়ার হোসাইন লাভলু এবং তাকে সহযোগিতা করেন আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর এডভোকেট মোঃ ফরিদুল আলম, এডভোকেট মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান এবং এডভোকেট মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম। অপরদিকে আসামী পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন এডভোকেট রিপন দে ও এডভোকেট তপন কুমার দাস।
রাষ্ট্রপক্ষে অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর এডভোকেট মোঃ সরোয়ার হোসাইন লাভলু বলেন “রাষ্ট্রপক্ষে আসামীদের বিরুদ্ধে মামলার ঘটনার বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষ সন্দেহতীত প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে এবং আসামীদেরকে উপযুক্ত শাস্তি দিয়েছে আদালত এবং ন্যায় বিচার নিশ্চিত হয়েছে। মামলার সংবাদদাতা ন্যায় বিচার পেয়েছে এবং বিজ্ঞ আদালত কর্তৃক এই ধরনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার কারণে সাধারণ মানুষ অন্যায় ও অপরাধ থেকে দূরে থাকবে।”
আপনার মতামত লিখুন :